Showing posts with label quran. Show all posts
Showing posts with label quran. Show all posts

Tuesday, June 4, 2024

সূরা আল-ফালাক  অর্থ ও শানে নুযুুল জেনে নিন।

সূরা আল-ফালাক অর্থ ও শানে নুযুুল জেনে নিন।

 


সূরা আল-ফালাক 

সূরা আল-ফালাক (আরবি: سورة الفلق; নিশিভোর) মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ কুরআনের ১১৩ তম সূরা; এর আয়াত, অর্থাৎ বাক্য সংখ্যা ৫ এবং রূকু, তথা অনুচ্ছেদ সংখ্যা ১। সূরা আল-ফালাক মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে; যদিও কোন কোন বর্ণনায় একে মক্কায় অবতীর্ণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়।[১] এর পাঁচ আয়াতে শয়তানের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার জন্য সংক্ষেপে আল্লাহর নিকট প্রার্থণা করা হয়। এই সূরাটি এবং এর পরবর্তী সূরা আন-নাসকে একত্রে মু'আওবিযাতাইন (আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার দু'টি সূরা) নামে উল্লেখ করা হয়। অসুস্থ অবস্থায় বা ঘুমের আগে এই সূরাটি পড়া একটি ঐতিহ্যগত সুন্নত।


নামকরণ

সূরা ফালাক ও সূরা আন-নাস আলাদা আলাদা সূরা হলেও এদের পারস্পরিক সম্পর্ক এত গভীর ও উভয়ের বিষয়বস্তু পরস্পরের সাথে এত বেশি নিকট সম্পর্কিত যে এদেরকে একত্রে “মু’আওবিযাতাইন” (আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার দু’টি সূরা) নামে ডাকা হয়; আর এই সূরা দু’টি নাযিলও হয়েছে একই সাথে একই ঘটনার পরি-প্রেক্ষিতে।


শানে নুযূল

সূরা আল ফালাক ও পরবর্তী সূরা নাস একই সাথে একই ঘটনায় অবতীর্ণ হয়েছে। মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে, জনৈক ইহু্দী রসূলুল্লাহ্‌ (সা:)- এর উপর জাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। [[জিবরাঈল] (আ:)] আগমন করে সংবাদ দিলেন যে, জনৈক ইহু্দী জাদু করেছে এবং যে জিনিসে জাদু করা হয়েছে, তা অমুক কুপের মধ্যে আছে। রসুলুল্লাহ (সা:) লোক পাঠিয়ে সেই জিনিস কূপ থেকে উদ্ধার করে আনলেন। তাতে কয়েকটি গিরু ছিল। তিনি এই সূরা দুটি পড়ে ফুক দেওয়ায় গিরুগুলো সাথে সাথে খুলে যায় এবং তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে শয্যা ত্যাগ করেন।


হযরত আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত আছে, রসুলুল্লাহ (সা:) - এর উপর জাদু করলে তার প্রভাবে তিনি মাঝে মাঝে দিশেহারা হয়ে পড়তেন এবং যে কাজটি করেননি, তাও করেছেন বলে অনুভব করতেন। একদিন তিনি হযরত আয়েশা (রা:) -কে বললেনঃ আমার রোগটা কি, আল্লাহ্ তা'আলা তা আমাকে বলে দিয়েছেন। (স্বপ্নে) দুব্যক্তি আমার কাছে আসল এবং একজন শিয়রের কাছে ও অন্যজন পায়ের কাছে বসে গেল। শিয়রের কাছে উপবিষ্ট ব্যক্তি অন্য জনকে বলল, তাঁর অসুখটা কি? অন্যজন বললঃ ইনি জাদুগ্রস্ত। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলঃ কে জাদু করেছে? উত্তর হল, ইহুদীদের মিত্র মুনাফিক লবীদ ইবনে আ'সাম জাদু করেছে। আবার প্রশ্ন হলঃ কি বস্তুতে জাদু করেছে? উত্তর হল, একটি চিরুনীতে। আবার প্রশ্ন হল, চিরুনীটি কোথায়? উত্তর হল, খেজুর ফলের আবরণীতে 'বির যরোয়ান' কূপে একটি পাথরের নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। অতঃপর রসূলুল্লাহ্‌ (সা:) সে কূপে গেলেন এবং বললেনঃ স্বপ্নে আমাকে এই কূপই দেখানো হয়েছে। অতঃপর চিরুনীটি সেখান থেকে বের করে আনলেন।


মুসনাদে আহমদের রেওয়ায়েতে আছে, রসুলুল্লাহ (সা:) -এর এই অসুখ ছয় মাস স্থায়ী হয়েছিল।


আয়াতসমূহ অর্থঃ 

আরবি ভাষায় উচ্চারণ  ও বাংলায় অনুবাদ


بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ

উচ্চারণঃ বিস্‌মিল্লাহির রাহ্‌মানির রাহীম


قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلۡفَلَقِ

উচ্চারণঃ ক্বুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক।

অর্থঃ বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার,


مِن شَرِّ مَا خَلَقَ

উচ্চারণঃ মিন শাররি মাখালাক্ব।

অর্থঃ তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে,


وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ

উচ্চারণঃ ওয়া মিন শাররি গাসিক্বিন ইযা অক্বাব।

অর্থঃ অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়,


وَمِن شَرِّ ٱلنَّفَّـٰثَـٰتِ فِى ٱلۡعُقَدِ

উচ্চারণঃ ওয়া মিন শাররিন নাফ্‌ফাসাতি ফিল্‌ উকাদ।

অর্থঃ গ্রন্থিতে ফুঁৎকার দিয়ে জাদুকারিণীদের অনিষ্ট থেকে


وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ

উচ্চারণঃ ওয়া মিন শাররি হাসিদিন ইযা হাসাদ।

অর্থঃ এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।


হাদিস

আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসায়ীর এক দীর্ঘ রেওয়ায়েতে রসুলুল্লাহ (সা:) বলেনঃ যে ব্যক্তি সকাল-বিকাল সূরা এখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করে তা তাকে বালা-মসীবত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে যথেষ্ট হয়। - (ইবনে-কাসীর)[৯]

সহীহ মুসলিমে ওকবা ইবনে আমের -এর বর্ণিত হাদীসে রসূলুল্লাহ (সা:) বলেনঃ তোমরা লক্ষ্য করেছ কি, অদ্য রাত্রিতে আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি এমন আয়াত নাযিল করেছেন, যার সমতুল্য আয়াত দেখা যায় না। অর্থাৎ ক্বুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক এবং ক্বুল আউযু বিরাব্বিল নাস আয়াতসমূহ। অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে, তওরাত, ইঞ্জীল, যাবুর এবং কোরআনেও অনুরূপ অন্য কোন সূরা নেই।

এক সফরে রসূলুল্লাহ (সা:) ওকবা ইবনে আমেন -কে সূরা ফালাক এবং সূরা নাস পাঠ করালেন, অত:পর মাগরিবের নামাযে এ সূরাদ্বয়ই তেলাওয়াত করে বললেনঃ এই সূরাদ্বয় নিদ্রা যাওয়ার সময় এবং নিদ্রা শেষে বিছানা থেকে উঠার সময়ও পাঠ করো। অন্য হাদীসে তিনি প্রত্যেক নামাযের পর সূরাদ্বয় পাঠ করার আদেশ করেছেন। - (আবু দাউদ, নাসায়ী)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাবীব বর্ণনা করেন, এক রাত্রিতে বৃষ্টি ও ভীষণ অন্ধকার ছিল। আমরা রসূলুল্লাহ (সা:) -কে খুঁজতে বের হলাম। যখন তাকে পেলাম, তখন প্রথমেই তিনি বললেনঃ বল। আমি আরয করলাম, কি বলব? তিনি বললেনঃ সূরা এখলাস ও সূরা নাস সূরাদ্বয়। সকাল-সন্ধ্যায় এগুলো তিন বার পাঠ করলে তুমি প্রত্যেক কষ্ট থেকে নিরাপদ থাকবে। - (মাযহারী)


পোষ্টটি  ভালো লাগলে শেয়ার করুন ইসলামের বাণী প্রচারে সহয়তা করুন।

Sunday, May 26, 2024

সূরা আন-নাস অর্থ সহ সারমর্ম ও শানে-নুজুল

সূরা আন-নাস অর্থ সহ সারমর্ম ও শানে-নুজুল



সূরা আন-নাস

সূরা আন-নাস (আরবি: سورة الناس; মানবজাতি) মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ কুরআনের ১১৪ তম এবং সর্বশেষ সূরা; এর আয়াত, অর্থাৎ বাক্য সংখ্যা ৬ এবং রূকু, তথা অনুচ্ছেদ সংখ্যা ১। সূরা আন-নাস মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে; যদিও কোন কোন বর্ণনায় একে মক্কায় অবতীর্ণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। এর ছয় আয়াতে শয়তানের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষার জন্য সংক্ষেপে আল্লাহর নিকট প্রার্থণা করা হয়। এই সূরাটি এবং এর পূর্ববর্তী সূরা আল-ফালাককে একত্রে মু'আওবিযাতাইন (আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার দু'টি সূরা) নামে উল্লেখ করা হয়। অসুস্থ অবস্থায় বা ঘুমের আগে এই সূরাটি পড়া একটি ঐতিহ্যগত সুন্নত।


নামকরণ

সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস আলাদা আলাদা সূরা হলেও এদের পারস্পরিক সম্পর্ক এত গভীর ও উভয়ের বিষয়বস্তু পরস্পরের সাথে এত বেশি নিকট সম্পর্কিত যে এদেরকে একত্রে “মু’আওবিযাতাইন” (আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার দু’টি সূরা) নামে ডাকা হয়; আর এই সূরা দু’টি নাযিলও হয়েছে একই সাথে একই ঘটনার পরি-প্রেক্ষিতে।


আয়াতসমূহ ও অর্থ

অর্থঃ

بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ۝‎‎

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

অর্থঃ পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে।


قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ ۝‎

ক্বুল আউযু বিরাব্বিন নাস।

অর্থঃ বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের পালনকর্তার


مَلِكِ ٱلنَّاسِ ۝‎

মালিকিন্নাস।

অর্থঃ মানুষের অধিপতির।


إِلَـٰهِ ٱلنَّاسِ ۝‎

ইলাহিন্নাস।

অর্থঃ মানুষের মা'বুদের।


مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ ۝‎

মিন শাররীল ওয়াস ওয়াসিল খান্নাস।

অর্থঃ তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় ও আত্মগোপন করে।


الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ ۝‎

আল্লাযি ইউওয়াস ইসু ফী সুদুরিন্নাস।

অর্থঃ যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে।


مِنَ الْجِنَّةِ وَ النَّاسِ ۝ ‎‎

মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস।

অর্থঃ জ্বিনের মধ্য থেকে অথবা মানুষের মধ্য থেকে।


শানে নুযূল

সূরা ফালাক ও পরবর্তী সূরা আন নাস একই সাথে একই ঘটনায় অবতীর্ণ হয়েছে। মুসনাদে আহমদে বর্ণিত আছে, জনৈক ইহু্দী রসূলুল্লাহ্‌ (সাঃ)- এর উপর জাদু করেছিল। ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। জিবরাঈল আগমন করে সংবাদ দিলেন যে, জনৈক ইহু্দী জাদু করেছে এবং যে জিনিসে জাদু করা হয়েছে, তা অমুক কুপের মধ্যে আছে। রসূলুল্লাহ্‌ লোক পাঠিয়ে সেই জিনিস কূপ থেকে উদ্ধার করে আনলেন। তাতে কয়েকটি গিরু ছিল। তিনি এই সূরা দুটি পড়ে ফুক দেওয়ায় গিরুগুলো সাথে সাথে খুলে যায় এবং তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে শয্যা ত্যাগ করেন।


হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত আছে, রসূলুল্লাহ্‌ - এর উপর জাদু করলে তার প্রভাবে তিনি মাঝে মাঝে দিশেহারা হয়ে পড়তেন এবং যে কাজটি করেননি, তাও করেছেন বলে অনুভব করতেন। একদিন তিনি হযরত আয়েশা -কে বললেনঃ আমার রোগটা কি, আল্লাহ্ তা'আলা তা আমাকে বলে দিয়েছেন। (স্বপ্নে) দুব্যক্তি আমার কাছে আসল এবং একজন শিয়রের কাছে ও অন্যজন পায়ের কাছে বসে গেল। শিয়রের কাছে উপবিষ্ট ব্যক্তি অন্য জনকে বলল, তাঁর অসুখটা কি? অন্যজন বললঃ ইনি জাদুগ্রস্ত। প্রথম ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলঃ কে জাদু করেছে? উত্তর হল, ইহুদীদের মিত্র মুনাফিক লবীদ ইবনে আ'সাম জাদু করেছে। আবার প্রশ্ন হলঃ কি বস্তুতে জাদু করেছে? উত্তর হল, একটি চিরুনীতে। আবার প্রশ্ন হল, চিরুনীটি কোথায়? উত্তর হল, খেজুর ফলের আবরণীতে 'বির যরোয়ান' কূপে একটি পাথরের নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। অতঃপর রসূলুল্লাহ্‌ তিনি কূপে গেলেন এবং বললেনঃ স্বপ্নে আমাকে এই কূপই দেখানো হয়েছে। অতঃপর চিরুনীটি সেখান থেকে বের করে আনলেন।


সুরা সম্পর্কিত হাদিস

আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসায়ীর এক দীর্ঘ রেওয়ায়েতে রসুলুল্লাহ বলেনঃ

যে ব্যক্তি সকাল-বিকাল সূরা এখলাস, ফালাক ও নাস পাঠ করে তা তাকে বালা-মুসীবত থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে যথেষ্ট হয়। - (ইবনে-কাসীর)


সহীহ মুসলিমে ওকবা ইবনে আমের -এর বর্ণিত হাদীসে রসূলুল্লাহ বলেনঃ

তোমরা লক্ষ্য করেছ কি, অদ্য রাত্রিতে আল্লাহ তাআলা আমার প্রতি এমন আয়াত নাযিল করেছেন, যার সমতুল্য আয়াত দেখা যায় না। অর্থাৎ ক্বুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক এবং ক্বুল আউযু বিরাব্বিন নাস আয়াতসমূহ। অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে, তওরাত, ইঞ্জীল, যাবুর এবং কোরআনেও অনুরূপ অন্য কোন সূরা নেই।


এক সফরে রসূলুল্লাহ ওকবা ইবনে আমেন -কে সূরা ফালাক এবং সূরা নাস পাঠ করালেন, অত:পর মাগরিবের নামাযে এ সূরাদ্বয়ই তেলাওয়াত করে বললেনঃ

এই সূরাদ্বয় নিদ্রা যাওয়ার সময় এবং নিদ্রা শেষে বিছানা থেকে উঠার সময়ও পাঠ করো।


অন্য হাদীসে তিনি প্রত্যেক নামাযের পর সূরাদ্বয় পাঠ করার আদেশ করেছেন। - (আবু দাউদ, নাসায়ী)


পোষ্টটি সবার মাঝে শেয়ার করুন ইসলাম প্রচারে সহযোগিতা করুন। 


Saturday, May 25, 2024

সুরায় ইখলাস বাংলা উচ্চারণ সহ সারমর্ম জেনে নিন।

সুরায় ইখলাস বাংলা উচ্চারণ সহ সারমর্ম জেনে নিন।



সুরায় ইখলাস

স্রষ্টার একত্ববাদের ঘোষণা বা একনিষ্ঠতা (Arabic: الْإِخْلَاص, আল-ইখলাস ) বা একত্ববাদ (আরবি: التوحيد, আত-তাওহীদ),যা সাধারণত সূরা আল-ইখলাস নামে পরিচিত, হলো কুরআনের ১১২ তম অধ্যায় (সূরা)।

কুরআন এর এই (সূরা)টি মুসলমাগণ বিশেষভাবে অনুশীলন করেন, এবং ইসলাম এর দ্বিতীয় উৎস (হাদিস) সূরাটিকে পুরো কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান বলে ঘোষণা করে। বলা হয় যে, সূরা ইখলাস (নবুয়ত লাভের পর) মুহাম্মাদ ও কুরাইশ পৌত্তলিকদের দ্বন্দ্ব চলাকালীন মুহাম্মাদ (সল্লল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে আল্লাহর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে চ্যালেঞ্জের জবাব দিয়েছিল।[৪]

আল-ইখলাস কেবল এই সূরার নামই নয়, এর বিষয়বস্তুর শিরোনামও, কারণ এটি একমাত্র তাওহীদের সাথে সম্পর্কিত। সাধারনত কুরআনের অন্যান্য সূরাগুলো তদ্বীয় একটি শব্দের নামে নামকরণ করা হয়েছে। তবে এই সূরাতে ইখলাস শব্দটি কোথাও পাওয়া যায় না। অর্থাৎ, এর অর্থ এবং বিষয় বিবেচনায় রেখে এ নাম দেওয়া হয়েছে।

সার সংক্ষেপ

1-4 স্রষ্টার একত্ববাদের ঘোষণা ও স্রষ্টার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রকাশ। 

মুসলমানগণ সওয়াব এর কাজ হিসেবে কুরআন সম্পূর্ণভাবে বা এর অংশবিশেষ আবৃত্তি এবং মুখস্থ করে থাকেন। শুদ্ধভাবে (তাজবিদ অনুসারে) কুরআন পাঠ করাকে একটি অতুলনীয় ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়।


অবতরণের পটভূমি

মুশরিকরা হযরত মুহাম্মদ (স:) - কে আল্লাহ্‌ তা'আলার বংশ পরিচয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিল , যার জওয়াবে এই সূরা নাযিল হয়। অন্য এক বিবরণে আছে যে , মদীনার ইহুদিরা এ প্রশ্ন করেছিল। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় রয়েছে যে , তারা আরও প্রশ্ন করেছিল- "আল্লাহ্‌ তা'আলা কিসের তৈরি ? স্বর্ণ-রৌপ্য নাকি অন্য কিছুর?" এর জওয়াবে সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে ৷[৮][৯]


পাণ্ডলিপি ও অনুবাদ

সূরা আল-ইখলাস

আবু আমর হাফস ইবনে সুলাইমান ইবনে আল মুগিরাহ ইবনে আবি দাউদ আল আসাদি আল কুফি (হাফস) প্রদত্ত আঞ্চলিক রীতিতে আল-ইখলাসের পাঠ:


بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ‎

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

قُلْ هُوَ ٱللَّهُ أَحَدٌ ۝‎

১. কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ

অর্থঃ বলুন ( হে নবি ), তিনি আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় ,


ٱللَّهُ ٱلصَّمَدُ ۝‎

২. আল্লাহুস সামাদ

অর্থঃ তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন ,


لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ ۝‎

৩. লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ

অর্থঃ তিনি কাউকে জন্ম দেননি ; কেউ তাঁকে জন্ম দেননি ,


وَلَمْ يَكُن لَّهُۥ كُفُوًا أَحَدٌۢ ۝‎

৪.ওয়ালাম ইয়াকুল লাহু কুফুওয়ান আহাদ

অর্থঃ আর তাঁর সমতুল্য কেউই নেই ।



ব্যাখ্যা

মূল নিবন্ধসমূহ: শিরক ও ইসলামের দৃষ্টিতে একত্ত্ববাদ

ইসলামের প্রারম্ভিক বছরগুলোতে কুরআনের কিছু সূরা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল, কখনও কখনও অঞ্চল অনুসারে বিভিন্ন সূরা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। এই সূরাটি সেগুলোর মধ্যে একটি। সূরাটি তাওহীদের একটি সংক্ষিপ্ত ঘোষণা, আল্লাহর একত্ববাদ সমন্বিত চারটি আয়াত। আল-ইখলাস অর্থ "বিশুদ্ধতা" বা "একনিষ্ঠতা"।


এটি মক্কায় নাকি মদিনায় অবতীর্ণ তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।তবে সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হওয়ার তথ্যই সম্ভাব্য এবং যুক্তিযুক্ত, বিশেষত যেহেতু এটি আবিসিনিয়ার বিলাল দ্বারা প্রমাণিত হয়, যিনি তাঁর নিষ্ঠুর কর্তা দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছিলেন এবং "আহাদ, আহাদ!" [(আল্লাহ) একক, একক!] বারবার বলছিলেন। উবাই ইবনে কা’ব হতে বর্ণিত যে, সূরাটি অবতীর্ণ হয় মুশরিকদের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে: "হে মুহাম্মাদ! তোমার প্রতিপালকের বংশপরিচয় আমাদেরকে বল।"


কুরআন ১১২:১-২ স্রষ্টার একত্ববাদ

সূরা আল ইখলাসে চারটি আয়াত রয়েছে:

১১২:১. বলুন: তিনি আল্লাহ, (যিনি) একক। 

১১২:২. আল্লাহ আস-সামাদ (অমুখাপেক্ষী)। 

১১২:৩. না তিনি কাউকে জন্ম দিয়েছেন, না তিনি জন্ম নিয়েছেন। 

১১২:৪. এবং কেউই তার সমতুল্য নয়।


এ বিষয়ে "তাফসির ইবনে কাসির" এ বলা হয়েছে,

যখন ইহুদিরা বলে, ‘আমরা আল্লাহর পুত্র উযায়েরকে উপাসনা করি’ এবং খ্রিস্টানরা বলে, ‘আমরা আল্লাহর পুত্র মাসীহ (ঈসা) এর উপাসনা করি’ এবং জুরোস্ত্রীরা বলে, ‘আমরা সূর্য ও চাঁদের উপাসনা করি’ এবং মুশরিকরা বলে ‘আমরা মূর্তিপূজা করি,' আল্লাহ তার রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন, "বলুনঃ তিনিই আল্লাহ এক। তিনিই এক, একক, তার কোন সমকক্ষ নেই, কোন সহকারী নেই, প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, সমান এবং তার তুলনাও নেই।"


এই শব্দটি (আল-আহাদ) পরাক্রমশালী আল্লাহ ছাড়া আর কারও পক্ষে ব্যবহার করা যাবে না, কারণ তিনি (আল্লাহ) তার সমস্ত গুণাবলীতে ও কর্মে নিখুঁত।


সুরায় ফাতিহা বাংলা উচ্চারণ সহ ও সারমর্ম ।

সুরায় ফাতিহা বাংলা উচ্চারণ সহ ও সারমর্ম ।



সূরা ফাতিহা

সূরা আল ফাতিহা (আরবি: سورة الفاتحة) মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ কুরআনের প্রথম সূরা, এর আয়াত সংখ্যা ৭ এবং রুকু সংখ্যা ১। ফাতিহা শব্দটি আরবি "ফাতহুন" শব্দজাত যার অর্থ "উন্মুক্তকরণ"। এটি আল্লাহ্ এর পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিদান স্বরূপ। সূরা ফাতিহা অন্যান্য সূরার ন্যায় বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম দিয়ে শুরু হয়েছে। আল ফাতিহা সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে বিধায় মক্কী সূরা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ। সূরা ফাতিহাকে ভেঙে ভেঙে পড়া যায় না বলে একে অখণ্ড সূরা নামেও ডাকা হয়। সূরা ফাতিহাকে ভেঙে পড়ার বিধান নেই।


আয়াতসমূহ ও অর্থ

بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ۝‎‎

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম

অর্থঃ পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে।

ٱلْحَمْدُ لِلَّٰهِ رَبِّ ٱلْعَالَمِينَ ۝‎

আলহামদুলিল্লা-হি রব্বিল আ-লামীন।

অর্থঃ সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যে।

ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ۝‎

আর রহমা-নির রহীম।

অর্থঃ অনন্ত দয়াময়, অতীব দয়ালু।

مَالِكِ يَوْمِ ٱلدِّينِ ۝‎

মা-লিকি ইয়াওমিদ্দীন।

অর্থঃ প্রতিফল দিবসের মালিক।

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ۝‎

ইয়্যা-কা না’বুদু ওয়া ইয়্যা-কানাছতা’ঈন।

অর্থঃ আমরা শুধু আপনারই দাসত্ব করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য কামনা করি।

ٱهْدِنَا ٱلصِّرَاطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ ۝‎

ইহদিনাসসিরা-তাল মুছতাকীম।

অর্থঃ আমাদের সরল পথনির্দেশ দান করুন।

صِرَاطَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ ۝‎

সিরা-তাল্লাযীনা আন’আম তা’আলাইহিম।

অর্থঃ তাদের পথে, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন।

غَيۡرِ ٱلْمَغْضُوبِ عَلَيۡهِمۡ وَلَا اَ۬لضَّآلِّينَ ص۝‎

গাইরিল মাগদূ বি’আলাইহীম ওয়ালাদ্দাল্লীন। (আমিন )

অর্থঃ এবং তাদের পথে নয় যারা আপনার ক্রোধের শিকার ও পথভ্রষ্ট । ( কবুল করুন )

ভাবানুবাদ

১:পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহর নামে।

২:সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যে।

৩:অনন্ত দয়াময়, অতীব দয়ালু।

৪:বিচার দিবসের মালিক।

৫:আমরা শুধু আপনারই দাসত্ব করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য কামনা করি।

৬:আমাদের সরল পথনির্দেশ দান করুন।

৭:তাদের পথে, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন, এবং তাদের পথে নয় যারা  আপনার ক্রোধের শিকার ও পথভ্রষ্ট । ( কবুল করুন )


নামকরণঃ

ফাতিহা শব্দটি আরবি "ফাতহুন" শব্দজাত যার অর্থ "উন্মুক্তকরণ"। এ সূরার বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখেই এর এই নামকরণ করা হয়েছে। যার সাহায্যে কোন বিষয়, গ্রন্থ বা জিনিসের উদ্বোধন করা হয় তাকে 'ফাতিহা' বলা হয়। অন্য কথায় বলা যায়, এ শব্দটি ভূমিকা এবং বক্তব্য শুরু করার অর্থ প্রকাশ করে।

হাদিসে এ সুরার আরও চারটি নাম পাওয়া যায় যার একটি হলো উম্মুল। তবে ইসলামী লেখালিখিতে এ সুরার অন্ততঃ ২৩ অভিধা রয়েছে।[৩] একে সাবআ মাসানী বা বহুল পঠিত সাত আয়াত বলা হয়।

এই সূরাটির অন্য কয়েকটি নাম রয়েছে। যেমন- ফাতিহাতুল কিতাব, উম্মুল কিতাব[৪][৫][৬], সূরাতুল-হামদ, সূরাতুস-সালাত, আস্‌-সাব্‌'য়ুল মাসানী এবং সূরাতুস শেফা।


নাযিল হওয়ার সময়-কালঃ

এটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভের একেবারেই প্রথম যুগের সূরা। বরং হাদীসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে জানা যায়, এটিই মুহাম্মাদের (সা.) ওপর নাযিলকৃত প্রথম পূর্ণাঙ্গ সূরা। এর আগে মাত্র বিচ্ছিন্ন কিছু আয়াত নাযিল হয়েছিল। সেগুলো সূরা 'আলাক্ব', 'মুয্‌যাম্‌মিল' ও 'মুদ্‌দাস্‌সির' ইত্যাদিতে সন্নিবেশিত হয়েছে।


বিষয়বস্তুঃ

আসলে এ সূরাটি হচ্ছে একটি দোয়া। যে কোন ব্যক্তি এ গ্রন্থটি পড়তে শুরু করলে আল্লাহ প্রথমে তাকে এ দোয়াটি শিখিয়ে দেন। গ্রন্থের শুরুতে এর স্থান দেয়ার অর্থই হচ্ছে এই যে, যদি যথার্থই এ গ্রন্থ থেকে তুমি লাভবান হতে চাও, তাহলে নিখিল বিশ্ব-জাহানের মালিক আল্লাহর কাছে দোয়া এবং সাহায্য প্রার্থনা করো।


মানুষের মনে যে বস্তুটির আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদা থাকে স্বভাবত মানুষ সেটিই চায় এবং সে জন্য দোয়া করে। আবার এমন অবস্থায় সে এই দোয়া করে যখন অনুভব করে যে, যে সত্তার কাছে সে দোয়া করছে তার আকাংখিত বস্তুটি তারই কাছে আছে। কাজেই কুরআনের শুরুতে এই দোয়ার শিক্ষা দিয়ে যেন মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, সত্য পথের সন্ধান লাভের জন্য এ গ্রন্থটি পড়, সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা নিয়ে এর পাতা ওলটাও এবং নিখিল বিশ্ব-জাহানের মালিক ও প্রভু আল্লাহ হচ্ছেন জ্ঞানের একমাত্র উৎস--- একথা জেনে নিয়ে একমাত্র তার কাছেই পথনির্দেশনার আর্জি পেশ করেই এ গ্রন্থটি পাঠের সূচনা কর।


এ বিষয়টি অনুধাবন করার পর একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআন ও সূরা ফাতিহার মধ্যকার আসল সম্পর্ক কোন বই ও তার ভূমিকার সম্পর্কের পর্যায়ভুক্ত নয়। বরং এ মধ্যকার আসল সম্পর্কটি দোয়া ও দোয়ার জবাবের পর্যায়ভুক্ত। সূরা ফাতিহা বান্দার পক্ষ থেকে একটি দোয়া। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআন তার জবাব । বান্দা দোয়া করে, "হে মহান প্রভু ! আমাকে পথ দেখাও"। জবাবে মহান প্রভু এই বলে সমগ্র কুরআন তার সামনে রেখে দেন, "এই নাও সেই হিদায়াত ও পথের দিশা যে জন্য তুমি আমার কাছে আবেদন জানিয়েছো "।


বৈশিষ্ট্য

এই সূরাটি আল কুরআনের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সূরা। প্রথমত এ সূরা দ্বারাই পবিত্র কোরআন আরম্ভ হয়েছে এবং এ সূরা দিয়েই সর্বশ্রেষ্ঠ এবাদত সালাত আরম্ভ করতে হয়। যে সকল সাহাবী সূরা আল-ফাতিহা সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন, তাদের সে বক্তব্যের অর্থ বোধহয় এই যে, পরিপূর্ণ সূরারূপে এর আগে আর কোনো সূরা নাযিল হয়নি। এ জন্যই এ সূরার নাম "ফাতিহাতুল-কিতাব" বা "কুরআনের উপক্রমণিকা" রাখা হয়েছে।

'সূরা আল্-ফাতিহা' এদিক দিয়ে সমগ্র কোরআনের সার-সংক্ষেপ। এ সূরায় সমগ্র কোরআনের সারমর্ম সংক্ষিপ্ত আকারে বলে দেয়া হয়েছে। কোরআনের অবশিষ্ট সূরাগুলো প্রকারান্তরে সূরা ফাতিহারই বিস্তৃত ব্যাখ্যা। তাই এ সূরাকে সহীহ হাদীসে 'উম্মুল কিতাব', 'উম্মুল কুরআন', 'কোরানে আযীম' বলেও অভিহিত করা হয়েছে।[৭] হযরত রসূলে কারীম এরশাদ করেছেন যে -

"যার হাতে আমার জীবন-মরণ, আমি তাঁর শপথ করে বলছি, সূরা আল-ফাতিহার দৃষ্টান্ত তাওরাত, ইনজীল, যাবুর প্রভৃতি অন্য আসমানী কিতাবে তো নেই-ই, এমনকি পবিত্র কোরআনেও এর দ্বিতীয় নেই।"


ইমাম তিরমিযী আবু হুরাইরাহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলে কারীম আরো বলেছেন যে -

"সূরায়ে ফাতিহা প্রত্যেক রোগের ঔষধবিশেষ।"


সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

এ সূরার প্রথম ও তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ্‌র গুণবাচক নামসমূহের মধ্যে আর-রাহমান ও আর-রাহীম উল্লিখিত হয়েছে। রহম শব্দের অর্থ হচ্ছে দয়া, অনুগ্রহ। এই 'রহম' ধাতু হতেই 'রহমান' ও 'রহীম' শব্দদ্বয় নির্গত হয়েছে। 'রহমান' শব্দটি আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারও জন্য ব্যবহার করা জায়েয নেই। অন্যদিকে 'রহীম' সৃষ্টজগতের কারও কারও গুণ হতে পারে। তবে আল্লাহ্‌র গুণ হলে সেটা যে অর্থে হবে অন্য কারও গুণ হলে সেটা একই অর্থে হবে না।


সূরাটির দ্বিতীয় আয়াতে আল-হামদু কথাটি আশ-শুক্-র্ থেকে অনেক ব্যাপক, যা আধিক্য ও পরিপূর্ণতা বুঝায়। 'আশ-শুক্-র্ লিল্লাহ' বলার অর্থ হতো এই যে, আমি আল্লাহ্‌র যে নিয়ামত পেয়েছি, সেজন্য আল্লাহ্‌র শুকরিয়া আদায় করছি। অপরদিকে 'আল-হামদুলিল্লাহ' এর সম্পর্ক শুধু নিয়ামত প্রাপ্তির সাথে নয়।[১] মানুষ যখন আল্লাহ্‌ ছাড়া অপর কারো গুণ সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে তার প্রশংসা করতে শুরু করে, তখন মানুষ তার ভক্তি-শ্রদ্ধার জালে বন্দী হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সে মানুষের দাসত্ব ও মানুষের পূজা করতে আরম্ভ করে। এই অবস্থা মানুষকে শিরকের পথে পরিচালিত করতে পারে। সে জন্য যাবতীয় 'হামদ' একমাত্র আল্লাহ্‌র জন্যই করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে।


সৃষ্টিজগতকে আলাম এবং বহুবচনে আলামীন বলা হয়। সূরা আশ-শু'আরার ২৩-২৪ আয়াতদুটিতে বলা হয়েছে,

ফিরআউন বলল : "রাব্বুল আলামীন কি?" মূসা বললেন : "যিনি আকাশসমূহ-ভূপৃষ্ঠ এবং এ দু'টির মধ্যবর্তী সমস্ত জিনিসের রব।"


রব হচ্ছেন যিনি সৃষ্টি করা, প্রতিটি জিনিসের পরিমাণ নির্ধারণ করা, পথ প্রদর্শন ও আইন বিধান দেওয়া, লালন-পালন করা, রিযিক্‌ দান করা, জীবনদান করা, মৃত্যু প্রদান করা, সন্তান দেয়া, আরোগ্য প্রদান করা ইত্যাদি সবকিছু করার ক্ষমতা রাখেন।[১] চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ্‌কে 'বিচার দিনের মালিক' বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বিচার দিন সম্পর্কে সূরা আল-ইনফিতারের ১৭-১৯ নং আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে,

"আর কিসে আপনাকে জানাবে প্রতিদান দিবস কী? তারপর বলি, কিসে আপনাকে জানাবে প্রতিদান দিবস কী? সেদিন কোনো মানুষ অন্য মানুষের জন্য কোনো কিছুর ক্ষমতা রাখবে না। আর সেদিন সকল বিষয় হবে আল্লাহর কর্তৃত্বে।"


পঞ্চম আয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্যসব উপাস্যের ইবাদাত করা ও সেগুলোর কাছে সাহায্য চাওয়াকে অস্বীকার করা হয়েছে। ইবাদত হল ভয়-ভীতি, আশা-আকাঙ্খার সাথে সেইসব কথা বা কাজ সম্পাদন করা, যা আল্লাহ পছন্দ করেন ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন। যেসব কথা ও কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন তা থেকে বিরত থাকাও ইবাদাত। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা অথবা কারো কাছে অলৌকিক সাহায্য কামনা করা শির্ক হিসেবে গণ্য হয়।


সূরাটির ষষ্ঠ আয়াতে হিদায়াত চাওয়া হয়েছে। স্নেহ ও করুণা এবং কল্যাণ কামনাসহ কাউকে মঙ্গলময় পথ দেখিয়ে দেয়া ও মনজিলে পৌঁছিয়ে দেয়াকে আরবী পরিভাষায় হিদায়াত বলে। 'হিদায়াত' শব্দটির দুইটি অর্থ। একটি পথ প্রদর্শন করা, আর দ্বিতীয়টি লক্ষ্য স্থলে পৌঁছিয়ে দেয়া। সিরাত শব্দের অর্থ হচ্ছে রাস্তা বা পথ। আর মুস্তাকীম হচ্ছে, সরল সোজা।[১]


সূরাটির শেষ আয়াত এর পূর্বের আয়াতের 'সরলপথ'-এর ব্যাখ্যা।

সূরা আল-ফাতিহার প্রথম তিনটি আয়াতে আল্লাহ্‌র প্রশংসার বর্ণনা করা হয়েছে এবং প্রশংসার সাথে সাথে ঈমানের মৌলিক নীতি ও আল্লাহ্‌র একত্ববাদের বর্ণনাও সূক্ষভাবে দেয়া হয়েছে। তৃতীয় আয়াতে এর দু'টি শব্দে প্রশংসার সাথে সাথে কিয়ামত ও পরকালের কথা বলা হয়েছে। চতুর্থ আয়াতের এক অংশে প্রশংসা এবং অপর অংশে দোয়া ও প্রার্থনা করা হয়েছে। مَـالِكِ يَوْمِ الدِّينِ - এর মধ্যে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মানুষ পরকালেও আল্লাহ্‌র মুখাপেক্ষী। প্রতিদান দিবসে আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কারো সাহায্য পাওয়া যাবে না। একজন বুদ্ধিমান ও বিবেকবান ব্যক্তি মনের গভীরতা থেকেই এ স্বতঃস্ফুর্ত স্বীকৃতি উচ্চারণ করছে যে, আমরা তোমাকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করি না। এ মৌলিক চাহিদাই إِيَّاكَ نَعْبُدُ তে বর্ণনা করা হয়েছে। অভাব পূরণকারী একক সত্তা আল্লাহ্‌, সুতরাং নিজের যাবতীয় কাজে সাহায্যও তার নিকট প্রার্থনা করবে। এ মৌলিক চাহিদাই বর্ণনা وإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এ করা হয়েছে। মোটকথা, এ চতুর্থ আয়াতে একদিকে আল্লাহ্‌র প্রশংসার সাথে একথারও স্বীকৃতি রয়েছে যে, ইবাদত ও শ্রদ্ধা পাওয়ার একমাত্র তিনিই যোগ্য। অপরদিকে তার নিকট সাহায্য ও সহায়তার প্রার্থনা করা এবং তৃতীয়তঃ আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করার শিক্ষাও দেয়া হয়েছে। শেষ তিনটি আয়াতে মানুষের দোয়া ও আবেদনের বিষয়বস্তু এবং এক বিশেষ প্রার্থনা পদ্ধতি শিক্ষা দেয়া হয়েছে।